?ফলহারিণী কালী? কথাটি এসেছে যিনি আমাদের কর্মফল হরণ করেন এবং মোক্ষ দান করেন। কর্মফল হরণ ক’রে তিনি আমাদের মুক্তি দেন। আমাদের জীবনের সমস্ত বিপদ, দুঃখ, দৈন্য, ব্যাধি ও সর্ব অশুভ শক্তির বিনাশ করেন তিনি। ঐশ্বর্য্য, আরোগ্য, বল, পুষ্টি, কীর্তি, বংশগৌরব, মোক্ষ সবই প্রদান করেন। এক কথায় পরম প্রাপ্তি ও পরমাত্মা দুটোই লাভ করা যায়। এই ফলহারিণী কালী পুজোয় সাধকের মনে আধ্যাত্ম্য চেতনার দ্রুত বিকাশ ঘটে।
মানুষ কেবলমাত্র কর্ম করার অধিকারী। কিন্তু ওই কর্মসমূহের ফল দান করার অধিকারিণী একমাত্র বিধাতাস্বরূপা দেবী কালিকা। কর্ম করলে সুকর্ম এবং কুকর্ম দুটিই সৃষ্ট হয়। উল্লিখিত ওই বিশেষ দিনটিতে মা স্বয়ং ভক্তদের সুকর্মের জন্য আশীর্বাদ প্রদান করেন। অপরদিকে, সন্তানের কুকর্মের জন্য উদ্ভূত অশুভ ফলের প্রভাব থেকে তিনিই আবার সন্তানদের মুক্ত করেন। অর্থাৎ ওই দিনে মা স্বয়ং যেমন সন্তানদের শুভ ফল প্রদান করেন, তেমনি তিনি সন্তানদের অশুভ ফলও হরণ করে থাকেন। সেই কারণে জ্যৈষ্ঠ অমাবস্যায় মা কালী ফলহারিণী মাতারূপে পূজিতা হন।
শ্রীশ্রী চণ্ডীতে উল্লেখ্য একটি বিশেষ মন্ত্রের সূত্র থেকে জানা যায়– ঋষি মার্কণ্ড স্বয়ং মাকে বলেছেন– “মৎসমঃ পাতকী নাস্তি পাপাঘ্নী ত্বৎসমা ন হি।
এবং জ্ঞাতা মহাদেবি যথাযোগ্যং তথা করু।।”
ঋষি দেবী মাকে বন্দনা করে বলেছেন, “হে মহাদেবী আমার মতো পাপী কেউ নেই, আবার তোমার মতো পাপহারিণীও কেউ নেই। তাই তুমি, আমার সমস্ত পাপ হরণ করে আমাকে মুক্ত করো। সেইজন্য, তোমার সম্পূর্ণ মহিমা কীর্তন করা আমার সাধ্যাতীত।
শ্রীশ্রী চণ্ডী থেকে আরও একটি মন্ত্র নিম্নে জানাচ্ছি– “পরিপূর্ণা করুণাস্তি চিন্ময়ি।
অপরাধপরম্পরাপরং ন হি মাতা সমুপেক্ষতে সুতম্।।”
হে, জগদম্বিকে! আমার ওপরে যে তোমার পূর্ণ কৃপাবর্ষণ হচ্ছে এতে আর আশ্চর্যের কথা কী! ছেলে অপরাধের পর অপরাধ করতে থাকে, তবুও মা ছেলেকে উপেক্ষা করে না।”
‘মা’ সতেরও মা, অসতেরও মা। এই চিরকালীন বাক্যটি সবারই জানা। এই প্রসঙ্গে আমার মনে হয়– সৎসন্তানের কর্মগুলিতে মা তৃপ্তি পান, অন্যদিকে অসৎ সন্তানের অপকর্মে মা অবশ্যই বিষণ্ণ হন এবং দুঃখ পান। এই মহাসত্যকে অস্বীকার করা অসম্ভব। অর্থাৎ সুকর্মে সুফল মিলবে, অপকর্মে কুফল মিলবে এইটি বিধির অমোঘ বিধান।
রামকৃষ্ণদেব ফলহারিণী পূজা করেছিলেন কারণ এই পূজা বিশেষভাবে সারদাদেবীকে দেবী রূপে আরাধনা করার জন্য পরিচিত। তিনি এই দিনে সারদাদেবীকে ষোড়শীদেবী হিসেবে পূজা করে নিজের সাধনার ফল এবং জপের মালা তাঁকে অর্পণ করেছিলেন। এই পূজার মাধ্যমে তিনি জগৎকল্যাণের জন্য সারদা দেবীর কাছে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
১২৮০ বঙ্গাব্দের ১৩ জৈষ্ঠ্য (১৮৮২ খ্রী) এল ফলহারিণী কালী পুজোর দিন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আঠেরো বছরের শ্রীমাকে সাক্ষাৎ ষোড়শী জ্ঞানে পুজো করলেন। মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে সমাধিমগ্ন হলেন ঠাকুর। বাহ্যজ্ঞান তিরোহিতা মা’ও তখন সমাধিস্থা। সাধক ও তাঁর আরাধ্যা দেবী আত্মস্বরূপে একীভূত হলেন। আধ্যাত্ম সাধনার আকাশে সেক্ষণে নিশ্চয়ই বেজে উঠেছিল অলৌকিক শঙ্খ। সম্বিৎ ফিরলে ঠাকুর প্রণাম করলেন মা’কে। অর্পণ করলেন নিজের সারা জীবনের সাধনার ফল এবং জপের মালা।
আপামর পৃথিবীবাসীর কাছে দাম্পত্যের এক যুগান্তকারী দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরলেন তিনি। গৃহে ও সমাজে রমণীদের স্থান কোথায় এবং তাদের প্রকৃত স্বরূপ কী- তা চেনালেন শ্রীরামকৃষ্ণ।
সেই পুজোয় পূজ্যা ও পূজক ছাড়া আর কারও প্রবেশের অনুমতি ছিল না।
উপযুক্ত আধার না হলে ঠাকুরের মতো সাধকের পুজো তিনি গ্রহণ করতে পারতেন না। পরে তাই মা’কে যখন জিজ্ঞেস করা হল, ঠাকুর ভগবান হলে আপনি কে? মা বলেছিলেন, আমি আর কে, আমি ভগবতী।
শুভ ফলহরিণী অমাবস্যা।
১১জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ?

