নিজস্ব সংবাদদাতা,শম্পা ঘোষ কলকাতা: উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটের হরকুটির রায় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের উদ্যোগে ৪ ও ৫ এপ্রিল আয়োজিত হল এক ব্যতিক্রমী আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী। ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও’ (Colors of Spring) শীর্ষক এই প্রদর্শনী ইতিমধ্যেই শিল্পমহলে বিশেষ সাড়া ফেলেছে।
দু’দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীতে অংশ নেন মোট ৩৮ জন আলোকচিত্রী। তাঁদের তোলা ৫৪টি নির্বাচিত ছবি প্রদর্শিত হয়, যেখানে একদিকে যেমন অভিজ্ঞ শিল্পীদের কাজ স্থান পেয়েছে, তেমনি সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবানদেরও। অনুষ্ঠানের বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী সিদ্ধার্থ পাল এবং মহেশ কুমার মিশ্র।
এই আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা অর্চিষ্মান রায় বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি হরকুটির রায় পরিবারের দ্বাদশ প্রজন্মের সদস্য। পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং আইআইটি খড়গপুরের সিনিয়র পিএইচডি স্কলার অর্চিষ্মান বর্তমানে ভারত সরকারের একটি তদন্ত সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত। এই প্রদর্শনী সফল করতে তাঁর পাশে ছিলেন বিশিষ্ট আলোকচিত্রী ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৃষিক বসু, যিনি ‘The Forthright Guy’ নামে পরিচিত।
উদ্যোক্তাদের দাবি, এই প্রদর্শনী শুধু শিল্পচর্চার ক্ষেত্রেই নয়, ঐতিহ্যবাহী এই বাড়ির সাংস্কৃতিক ধারাকেও নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রসঙ্গত, হরকুটির রায় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপূজা প্রায় ৩৩৩ বছরের প্রাচীন এবং সুপ্রসিদ্ধ। এই বাড়ির আঙিনায় অতীতে পদার্পণ করেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, তৈলঙ্গ স্বামী, বামাক্ষ্যাপা সহ বহু সাধু-মহাত্মা।
এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে আজও নিয়মিতভাবে দুর্গাপূজা, রতন্তী কালীপূজা, শিবরাত্রি সহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। পাশাপাশি জন্মাষ্টমী, রথযাত্রা ও উল্টো রথের মতো উৎসবও আয়োজিত হয় যথাযথ মর্যাদায়। বাড়ির কুলদেবতা শ্রীধরনারায়ণ জি এবং শ্রীরামকৃষ্ণ প্রতিষ্ঠিত কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ ‘শ্রীধেশ্বর মহারাজ’-এর নিত্য পূজা এখানে একটি বিশেষ আকর্ষণ।
শুধু ধর্মীয় আচারই নয়, বছরজুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনীরও আয়োজন করে এই পরিবার। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে ‘Festivals of India’ থিমে আরও একটি বৃহত্তর প্রদর্শনীর পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে।
ঐতিহ্যের পাশাপাশি এই বাড়ির গৌরবোজ্জ্বল অতীতও সমানভাবে উল্লেখযোগ্য। পরিবারের পঞ্চম প্রজন্মের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব সঙ্গীত মহাগুরু হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ধ্রুপদ সঙ্গীতের প্রসারে অসামান্য অবদান রাখেন। তাঁর কাছে তালিম নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সঙ্গীত জীবনের প্রাথমিক গুরু গঙ্গানারায়ণ চট্টোপাধ্যায় এবং কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞ যদু ভট্ট।
সঙ্গীত, সাধনা ও পাণ্ডিত্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ হিসেবে হরকুটির রায়বাড়ি আজও উত্তর কলকাতার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে।

